০৫
আশ্বিন • October
রবিবার / Sunday
October 05, 2026
11:35:00 PM • রাত ১১:৩৫
Home কলকাতা কোথায় গেল কালীঘাটের মা কালীর গয়না? উধাও ভল্টের চাবিও !
কলকাতাকলকাতা

কোথায় গেল কালীঘাটের মা কালীর গয়না? উধাও ভল্টের চাবিও !

Share
কোথায় গেল কালীঘাটের মা কালীর গয়না? উধাও ভল্টের চাবিও !
কোথায় গেল মায়ের গয়না ? প্রশ্ন কালীঘাটে। ছবি : ফেসবুক
Share

কলকাতা: সতীপীঠের অন্যতম পবিত্র ও জাগ্রত স্থান কালীঘাট। 

মায়ের দেহাংশ প্রাপ্তি থেকে শুরু করে এই ঐতিহাসিক মন্দির প্রতিষ্ঠা। পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের নাম ও ইতিহাস। অথচ সেই খাস কালীঘাট মন্দিরেই কি না অবাধে চলছে ধনসম্পদের লুটপাট ! 

মায়ের নামে থাকা কোটি কোটি টাকার গয়না, ধনরত্ন এবং যুগ যুগ ধরে অগণিত ভক্তদের দান করা বহুমূল্য সামগ্রী এখন ঠিক কোথায়? সেগুলির সর্বশেষ হিসাবই বা কবে হয়েছিল? ঠিক এই জ্বলন্ত প্রশ্নগুলি তুলেই এবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা জজের কাছে কড়া লিখিত অভিযোগ দায়ের করল সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ। পদাধিকারবলে জেলা জজই কালীঘাট মন্দির কমিটির চেয়ারম্যান। এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসতেই রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে পুণ্যার্থী থেকে শুরু করে ওয়াকিবহাল মহলে।

উধাও ভল্টের চাবি, প্রশ্নের মুখে মায়ের গয়না 

পরিবার পরিষদের সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগটি হল মায়ের গয়না সংরক্ষণের ভল্ট নিয়ে। তাদের দাবি, দেবীর মূল্যবান অলঙ্কার ও অন্যান্য বিপুল সম্পদ সুরক্ষিত রাখার জন্য একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে নির্দিষ্ট ভল্ট রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, ১৯৮০ সাল থেকে সেই ভল্টের চাবির কোনও খোঁজ নেই। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে উধাও সেই চাবি। ফলে ভল্টের ভিতরে গচ্ছিত রাখা গয়নাগাটি আদৌ আছে কি না, বা থাকলেও কী অবস্থায় আছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তা।

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায়চৌধুরীর স্পষ্ট অভিযোগ, “আমরা লিখিতভাবে বিচারককে জানিয়েছি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের যে ভল্টে মায়ের সম্পদ ও গয়না থাকে, ১৯৮০ সাল থেকে তার চাবির হদিশ নেই। মন্দিরের সম্পদের হিসাব রাখার জন্য যে কমিটি গড়া হয়েছিল, তার মেয়াদ ফুরিয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। ফলে বছরের পর বছর ধরে সম্পদের কোনও হিসাবই হয়নি।” 

এই দীর্ঘ সময়ে সম্পদের নয়ছয় হওয়ার প্রবল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পরিষদ। বিষয়টি শুধুমাত্র আর্থিক অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অগণিত ভক্তের বিশ্বাস এবং আবেগ। তাই চাবি হারানোর ঘটনায় অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দেওয়া হোক এবং ভল্ট ভেঙে নিরপেক্ষভাবে সমস্ত সামগ্রীর তালিকা প্রস্তুত করা হোক— জেলা জজের কাছে এই কড়া দাবিও জানিয়েছে তারা।

২০১৪ সাল থেকে থমকে নির্বাচন, অমান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ 

শুধু গয়না চুরি বা লুটপাটের আশঙ্কাই নয়, কালীঘাট মন্দিরের সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েও একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলেছে সাবর্ণ পরিবার। অভিযোগ, মন্দির পরিচালন কমিটির নির্বাচন গত ২০১৪ সালের পর থেকে আর হয়নি। অথচ মন্দির সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত এই কমিটির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর। নিয়ম অনুযায়ী, সেবায়েতদের মধ্য থেকে পাঁচজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কথা। এর পাশাপাশি মন্দিরের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, এমন ছয়জন বহিরাগত সদস্যেরও কমিটিতে থাকার আইনি বিধান রয়েছে। একটি বণিকসভার প্রতিনিধিরও কমিটিতে থাকার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বণিকসভার হয়ে যিনি প্রতিনিধিত্ব করতেন, তাঁর মৃত্যুর পর নতুন প্রতিনিধি চেয়ে মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফে আর কোনও যোগাযোগই করা হয়নি বলে অভিযোগ।

অরাজকতা, হেনস্তা এবং হাইকোর্টের নির্দেশ অবমাননা 

ভক্তদের দেওয়া দানসামগ্রী ঠিকমতো দেখভাল করার জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা প্রশাসনকে (ডিএম অফিস) দায়িত্ব দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। অভিযোগকারীদের দাবি, বাস্তবে সেই নির্দেশের কোনও প্রতিফলন নেই। দেবর্ষিবাবুর কথায়, “মন্দিরে গেলেই বোঝা যায়, কতটা অরাজকতা চলছে। হাইকোর্টের আদেশকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভক্তদের হেনস্তা থেকে শুরু করে দেবী দর্শনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি, গর্ভগৃহে নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে যেমন খুশি অবাধ প্রবেশ চলছে।”

আর্থিক অনিয়মের পুরনো বিতর্ক 

কালীঘাট মন্দিরে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০০৬ সালে এই বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সেই সময় মন্দিরের তৎকালীন চেয়ারম্যান তথা জেলা জজ সেখানকার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তখন অভিযোগ উঠেছিল যে, ভক্তদের দেওয়া বিপুল প্রণামীর সম্পূর্ণ অংশ নির্ধারিত জায়গায় জমা পড়ছে না। পুজোর পালা বহিরাগতদের কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করে দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগও সামনে এসেছিল। প্রায় দু’দশক পর ভল্টের চাবি ও দেবীর সম্পদের হিসাব নিয়ে নতুন করে অভিযোগ ওঠায় সেই পুরনো বিতর্কই ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।

কী বলছে মন্দির কর্তৃপক্ষ? 

অভিযোগের তির যাঁদের দিকে, সেই মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফেও মিলেছে প্রতিক্রিয়া। মন্দিরের কোষাধ্যক্ষ পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা কল্যাণ হালদার জানিয়েছেন, ‘কাউন্সিল অব সেবায়েতস’ এই নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সম্পাদক সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন এবং চেয়ারম্যান অসুস্থ ও শয্যাশায়ী। মূলত সেই কারণেই এতদিন নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেছেন, “নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি জেলা জজকেও জানানো হয়েছে। সব কিছু ঠিকঠাক চললে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে।”

এখন দেখার বিষয়, সাবর্ণ পরিবারের এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা জজ কোনও তদন্ত বা কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দেন কি না। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ ভল্টের চাবি এবং মা কালীর গয়নার প্রকৃত হিসাব শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন অগণিত ভক্ত ও সাধারণ মানুষ।

হিডেন স্টোরিজ নিউজ 

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *