নয়াদিল্লি: ২০২০ সালের রক্তাক্ত গালওয়ান সংঘাতের পর এই প্রথম ভারতের মাটিতে পা রাখলেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে শনিবার বিশেষ বিমানে নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি। দীর্ঘ ছ বছর পর জিনপিংয়ের এই ভারত সফরকে ঘিরে কূটনীতির পারদ যেমন চড়েছে, তেমনই রাজধানী শহরকে মুড়ে ফেলা হয়েছে নজিরবিহীন এক দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীতে। প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের এই মাত্র ২৪ ঘণ্টার সফর সুনিশ্চিত করতে দিল্লিতে মোতায়েন করা হয়েছে ১৫ হাজারেরও বেশি পুলিশ কর্মী এবং ২০০ কোম্পানিরও বেশি আধাসামরিক বাহিনী।
শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসার কথা রয়েছে চিনা প্রেসিডেন্টের। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিই এই বৈঠকের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে। জিনপিংয়ের এই সফরে তাঁর সঙ্গে এসেছে এক উচ্চপর্যায়ের চিনা প্রতিনিধিদল, যার মধ্যে রয়েছেন বেইজিংয়ের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও শিল্পপতিরা।
প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে একাধিক কেন্দ্রীয় ও রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থা একযোগে কাজ করছে। তিনি যে বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করবেন, তার চারপাশের আকাশসীমা সম্পূর্ণ ‘নো-ফ্লাই জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
হোটেলের অন্দরে ও বাইরে মোতায়েন রয়েছে অ্যান্টি-টেরর এবং বোম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড। সাধারণ চেকিংয়ের পাশাপাশি জিনপিংয়ের নিরাপত্তার স্বার্থে পারমাণবিক, তেজস্ক্রিয় ও বায়োকেমিক্যাল (জৈব-রাসায়নিক) হামলার আশঙ্কা খতিয়ে দেখতে চালানো হচ্ছে বিশেষ পরীক্ষা। এমনকি হোটেলের ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাও নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে সিল করে দেওয়া হয়েছে।
চিনা প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল প্রায় দশ দিন আগেই। প্রায় ১০ দিন আগে একটি বিশেষ চিনা কার্গো বিমানে চেপে ভারতে পৌঁছায় জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত বুলেটপ্রুফ লিমুজিন, ‘হংকি’ (Hongqi)। সঙ্গে আনা হয়েছে ব্যাকআপ গাড়ি এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জাম।
যদিও ভারতীয় আইন মেনে বিদেশি নিরাপত্তা বাহিনীর স্যাটেলাইট সঞ্চলন সরঞ্জাম বা বিশেষ কিছু অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রাখা হয়েছে এবং সেগুলি আবগারি বিভাগের কাছে জমা রাখা হয়েছে। সমগ্র প্রক্রিয়াটি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দিল্লি পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে জিনপিংয়ের ব্যবহৃত বিশেষ বিমানটিও। চিনের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি ব্যবহার করেন এয়ার চায়নার একটি সংশোধিত বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমান, যা আদতে বেইজিংয়ের এক উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার।
২০১৬ সাল থেকে কার্যকর এই বিমানটি এনক্রিপ্টেড স্যাটেলাইট কম্যুনিকেশন, মিসাইল ডিফেন্স কাউন্টারমেজারস এবং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস (EMP) প্রতিরোধী প্রযুক্তিতে সজ্জিত, যা যেকোনো জরুরি অবস্থায় বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সাথে যোগাযোগ রাখতে সক্ষম।
রবিবার সকাল ১১টা নাগাদ সম্মেলন কেন্দ্র ভারত মণ্ডপম থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন জিনপিং। সেই পথ সুগম রাখতে বিমানবন্দর থেকে শান্তিপথ পর্যন্ত বসানো হয়েছে ৭০০টিরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা। তুঘলক রোড থানায় খোলা হয়েছে একটি বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, যেখান থেকে ৫০০টি ক্যামেরার লাইভ ফিড পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গালওয়ান সংঘাতের বরফ গলিয়ে শি-এর এই ২৪ ঘণ্টার দিল্লি সফর এশীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।
হিডেন স্টোরিজ নিউজ
Leave a comment